আজ বিশ্ব এইডস দিবস, কেন আজ পালিত হয় এই দিন? কেনো ৪০ বছর পরেও আবিষ্কার হয়নি প্রতিষেধক?

ইউবিজি নিউজ ব্যুরো : আজ বিশ্ব এইডস দিবস। রোগের নাম শুনলে আজও কেঁপে ওঠেন সাধারণ মানুষ। অত্যাধুনিক চিকিৎসা বেরিয়েছে রোগের। তাতেও মিথ ভাঙেনি। রোগের থেকেও সবার বেশি ভয় রোগের সঙ্গে জুড়ে থাকা একাধিক ভ্রান্ত ধারণা (AIDS Myths) নিয়ে। যা রোগ এবং রোগী—উভয়কেই সমাজ থেকে ব্রাত্য করে রেখেছে আজও। এবং এই জন্যেই রোগের সঠিক উপসর্গ (AIDS Symptom) নিয়ে ধারণা নেই স্বয়ং রোগীরও।

এইডসের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ১৯৮৮ সাল থেকে দিবসটি পালন হয়ে আসছে। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘এইডস নির্মূলে প্রয়োজন : জনগণের অংশগ্রহণ’।ভয়াবহ এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে বিশ্বজুড়ে নানা কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে প্রতি বছরই পালিত হয় এই দিনটি।

এইডস আসলে কী?

এইডস হলো, একোয়াট ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রম। একে আমরা সংক্ষেপে এইডস বলি। এটি আসলে একটি ভাইরাসের আক্রমণের কারণে হতে পারে। এই ভাইরাসকে আমরা বলি এইচআইভি ভাইরাস। এইচআইভি মানে ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস।

এইডসের লক্ষণ কী?

আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো অনেক পড়ে প্রকাশ পায়। দেখা গেছে, এই রোগটি প্রকাশ পেতে আট থেকে ১০ বছর সময় লাগে। কেউ যদি নিজে চিকিৎসকের কাছে যায় এবং জানায় যে তার অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক রয়েছে, সে ক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি রোগ নির্ণয় করা যায়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে লক্ষণগুলো প্রকাশ না পাওয়ার কারণে চিকিৎসকের কাছে রোগীরা অনেক দেরি করে আসে।

আরেকটি বিষয় হলো, মায়ের থেকে এইচআইভি যদি বাচ্চাদের ছড়ায়, তাহলে আমরা বাচ্চাদের স্ক্রিনিং করি। যদি বাচ্চারা নেগেটিভ হয়, তাহলে তো তাদের কোনো ঝুঁকি নেই। বিভিন্ন চিকিৎসাব্যবস্থা রয়েছে, এর মাধ্যমে নেগেটিভ হতে পারে। তবে আমরা যেহেতু জানি, আক্রান্ত মায়ের কাছ থেকে হচ্ছে, তাই আমরা আগেভাগে নির্ণয় করতে পারি।

বিজ্ঞানীরা ১৯৮০ সালে প্রথম এইডসের (AIDS) সম্পর্কে জানতে পারেন। ভারতে ১৯৮৬ সালে প্রথম এইডসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মেলে। তার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ভারতে এইডসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২৩ লক্ষ ৪৯ হাজার।

ভয়ঙ্কর এই রোগ সম্পর্কে জানার পর পেরিয়ে গিয়েছে দীর্ঘ ৪০ বছর। কিন্তু এখনও বিশ্বের কোনও দেশই এর প্রতিষেধক তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু কেন ৪০ বছর পরেও এইডসের প্রতিষেধক তৈরি করতে পারলেন না বিজ্ঞানীরা? চলুন তেমন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নজর দেওয়া যাক…

এই প্রতিষেধক নিয়ে দীর্ঘ গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মানব শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে, এমন কোনও প্রতিষেধকই এইডসের (AIDS) বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে পারেনি। এখনও পর্যন্ত কোনও প্রতিষেধকই এই রোগের বিরুদ্ধে আগাম সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।

রোগীর শরীরে রোগ প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি করে প্রতিষেধক কেবল এই ভাইরাসের সংক্রমণের গতি কমিয়ে দেয়, কিন্তু এটিকে থামাতে পারে না। HIV সংক্রমণের পরে রোগীর স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব।

HIV-তে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে কোনও রকম প্রতিরোধ ক্ষমতা কাজ করে না বলে বিজ্ঞানীরা প্রতিষেধকের সাহায্যে শরীরে অ্যান্টিবডির সংখ্যা বা শক্তি বৃদ্ধি করতে পারেন না।

HIV এমন ধরনের ভাইরাস যা দীর্ঘদিন কোনও রকম উপসর্গ ছাড়াই আক্রান্তের শরীরে লুকিয়ে থাকতে পারে, বাড়তে থাকে। ফলে ডিএনএ-তে লুকানো ভাইরাস খুঁজে পাওয়া এবং সেটিকে ধ্বংস করা শরীরের অ্যান্টিবডির পক্ষেও কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও এই ভাইরাসকে দমন করার ক্ষেত্রে একই রকম সমস্যা হয়।

অনেক ক্ষেত্রে শরীরে বাসা বাঁধা দুর্বল ভাইরাসকে কাজে লাগিয়ে, তার ডিএনএ-র গঠন বিশ্লেষণ করে প্রতিষেধক তৈরির চেষ্টা করেন বিজ্ঞানীরা। কিন্তু HIV-এর ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া কার্যকর হয়নি। তাছাড়া, অধিকাংশ প্রতিষেধক মানুষের শ্বাসযন্ত্র এবং অন্ত্রের মাধ্যমে ক্রিয়াশীল হয়। কিন্তু HIV মানুষের যৌনাঙ্গ ও রক্তের মাধ্যমে সারা শরীরে দ্রুত সংক্রমিত হয়। ফলে একে রোখা বেশ মুশকিল।

যে কোনও প্রতিষেধক তৈরির পর সেটি মানব শরীরে প্রয়োগের আগে কোনও সমতুল্য ডিনএ-গঠনযুক্ত প্রাণীর শরীরে প্রয়োগ করে দেখা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এইডসের (AIDS) প্রতিষেধক তৈরির ক্ষেত্রে এমন কোনও প্রাণীর মডেল নেই, যার ভিত্তিতে ভ্যাকসিন মানুষের জন্য প্রস্তুত করা যেতে পারে।

এইডসের (AIDS) ভাইরাস অত্যন্ত দ্রুত তার চরিত্র ও গঠনে পরিবর্তন ঘটায়। ফলে কোনও নির্দিষ্ট চরিত্র ও গঠন অনুযায়ী তৈরি প্রতিষেধক এই ভাইরাসকে রুখতে পারে না। তাই দীর্ঘ ৪০ বছর পরেও এইডসের (AIDS) প্রতিষেধক তৈরি করে উঠতে পারেননি বিশ্বের তাবড় বিজ্ঞানীরা।

এইডস নিয়ে তৈরি ছ-টি সত্যাসত্য জেনে নিন বিশ্ব এইডস দিবসে—

১. মিথ্যে – চুম্বনে ছড়ায় AIDS.
সত্য – HIV পজিটিভ আক্রান্তের লালায় এই রোগের জীবাণু প্রায় থাকে বললেই চলে। তাই চুম্বনে এই রোগ ছড়ায় না।

২. মিথ্যে – জল HIV/AIDS-এর বাহক
সত্য- HIV রোগী যে স্যুইমিং পুলে সাঁতার কাটেন সেখানে সুস্থ মানুষ সাঁতার কাটলে কিছুই হয় না। এমনকি, রোগীর জামাকাপড়, বা এঁটো করা জল খেলেও এই রোদ হবে না। যে টয়লেট রোগী ব্যবহার করেন সেই টয়লেট সুস্থরাও অনায়াসে ব্যবহার করতে পারেন।

৩. মিথ্যে – HIV রোগীর পাশে বসলেই AIDS হবে
সত্য- হাওয়ায় এই রোগের জীবাণু ছড়ায় না। তাই শুধু পাশে বসা নয়, রোগীর হাঁচি-কাশি বা থুথু থেকেও এই রোগ ছড়ায় না।

৪. মিথ্যে – HIV রোগীকে কামড়ানো মশা রোগের বাহক
সত্য- মশা থেকে অনেক প্রাণহানিকর রোগ অবশ্যই হয়। তবে এইডস নয়।

৫. মিথ্যে- যখন-তখন AIDS হতে পারে
সত্য – এই রোগীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করলে, রক্ত নিলে, রোগীর ব্যবহৃত সিরিঞ্জ অন্য কারোর শরীরে ফোঁটালে এই রোগ হয়।

6. মিথ্যে – ট্যাটু বা পিয়ার্সিং AIDS ডেকে আনে
7. সত্য – AIDS রোগীর শরীরে ব্যবহৃত সূঁচ দিয়ে ট্যাটু আঁকলে বা নাক-কান বেঁধালে তবেই আপনি আক্রান্ত হবেন। নচেৎ নয়।