শীতলকুচি কাণ্ডে নয়া মোড়, পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর রিপোর্টে ফারাক

ইউবিজি NEWS DESK: ভোটগ্রহণের দিন বুথে দাঁড়িয়ে থাকা ভোটারদের লক্ষ্য করে বুথে থাকা কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের ঠাণ্ডা মাথায় গুলিবর্ষণ। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এর চেয়ে কলঙ্কের ঘটনা আর কীই বা হতে পারে। সেই ঘটনায় গেরুয়া বাহিনীর রাজ্যের সব তাবড় তাবড় নেতারা মুখে কুলুপ এঁটেছেন। খালি সেই ঘটনা নিয়ে নির্লজ্জ মিথ্যাচার করে চলেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী।

দুঃখপ্রকাশ তো দূরের কথা, উল্টে বিষয়টি নিয়ে রীতিমত রাজনৈতিক ভাবে আক্রমণ শুরু করেছেন তিনি। এও দেশের কাছে চরমতম দুর্ভাগ্যের বিষয়। দেশের প্রধানমন্ত্রী দেশের নাগরিক ও ভোটারদের তুলনা করছেন জঙ্গিদের সঙ্গে। সামান্য মনুষ্যত্ববোধ থাকলে অন্তত দুঃখপ্রকাশটুকু অন্তত করতেন। ঠিক এই রকম প্রেক্ষাপটেই সামনে এল কোচবিহারের শীতলকুচিতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলি চালনার ঘটনায় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর দুই পৃথক পৃথক রিপোর্ট। সেই দুই রিপোর্টেই কার্যত বিস্তর ফারাক নজর পড়েছে অনেকেরই।

প্রথমেই আসা যাক পুলিশের কথায়। শীতলকুচির ঘটনা নিয়ে কোচবিহারের পুলিশ সুপার দেবাশিস ধর নির্বাচন কমিশনকে যে রিপোর্ট দিয়েছেন তাতে লেখা হয়েছে, যে বুথে গুলি চালনার ঘটনা ঘটেছে সেখানে ঘটনার আগে এক যুবক অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তাঁর চিকিৎসা করছিল স্থানীয় কয়েকজন যুবক। সেই সময় তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করছিল বাহিনীর কয়েক জন জওয়ান। ঠিক তখনই গুজব ছড়ায়, সিআইএসএফের মারে ওই যুবক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

তার পরই প্রায় তিনশো-সাড়ে তিনশো গ্রামবাসী, যাঁদের মধ্যে অধিকাংশই মহিলা, জওয়ানদের ঘিরে ধরে। তার জেরেই ওই বুথে উত্তেজনা ছড়ায়। গ্রামবাসীরা অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের কাছ থেকে। এমনকী, ব্যালট ছিনতাইয়ের অবস্থাও তৈরি হয়। তখন নিয়ম মেনেই গুলি চালায় বাহিনী। ১৫ রাউন্ড গুলি চলে। তাতেই ৪ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় কয়েকজন সিআইএসএফ জওয়ানও জখম হয়েছেন। জখম হয়েছেন হোমগার্ডও।

এবার আসা যাক কেন্দ্রীয় বাহিনীর কো-অর্ডিনেটরের দেওয়া রিপোর্টের প্রসঙ্গে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর কো-অর্ডিনেশন অফিসার অশ্বিনী কুমার সিং তাঁর রিপোর্টে কমিশনকে জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ শীতলকুচির ১২৬ নম্বর বুথের কাছে ১০-১৫ জন দুষ্কৃতী ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ভোটারদেরও বাধা দিচ্ছিল তারা। কেন্দ্রীয় বাহিনী স্থানীয় পুলিশকে নিয়ে তাদের সরানোর চেষ্টা করে।

সেই ধ্বস্তাধ্বস্তিতে একটি বাচ্চা পড়ে যায়। তার পরই সিআইএসএফের গাড়ি ভাঙে তারা। শূন্যে গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এর প্রায় ১ ঘণ্টা পর আরও ১৫০ জন জনতা ফের ঘিরে ধরে জওয়ানদের। ওদের সরাতে হাওয়ায় দু-রাউন্ড গুলি চালায় বাহিনী। তাতেও দমেনি দুষ্কৃতীরা। এগিয়ে আসতে থাকে বাহিনীর দিকে। তখন আত্মরক্ষার স্বার্থে উন্মত্ত জনতার দিকে গুলি চালায় বাহিনী।

এবার আসা যাক দুই রিপোর্টের ফারাক প্রসঙ্গে। জেলার পুলিশ সুপার যে সব দাবি করেছেন এদিন ঘটনার পর তার অনেক কিছজুই মেলেনি। বুথের মধ্যে কোনও যুবক আদৌ অসুস্থ হয়েছিল কিনা সেটাই জোর গলায় কেউ বলতে পারেননি। না ভোটাররা, না এলাকার বাসিন্দারা, না কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা, না সংবাদমাধ্যমের কোনও প্রতিনিধিরা। এমনকি সেই যুবকের নাম পরিচয়ও সামনে আসেনি। সত্যিই কী বুথে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন নাকি এই অসুস্থতার গল্প বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আসল সত্যকে ধামাচাপা দিতে। প্রাণপণে কোনও সত্যকে আড়াল করে রাখার জন্য। সেই প্রশ্ন কিন্তু উঠে গিয়েছে।

পুলিশ সুপার তাঁর রিপোর্টে এই কথাও বলেছেন এদিনের ঘটনায় নাকি কয়েকজন সিআইএসএফ জওয়ানও জখম হয়েছেন। জখম হয়েছেন হোমগার্ডও। এই দাবিরও সমর্থনে কোনও বাস্তব তথ্য বা চিত্র মেলেনি। এখনও পর্যন্ত কেন্দ্রীয় বাহিনীর তরফেও এই দাবি করা হয়নি। আবার কেন্দ্রীয় বাহিনী যে দাবি করেছে প্রথমে শূন্যে গুলি চালানোর সেই দাবিও স্থানীয়রা কেউ মানতে চাননি। আর সব থেকে বড় কথা

এদিনের ঘটনার পরে কোনও অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, কেউ দাবি করেননি যারা কেন্দ্রীয় বাহিনীর কাছ থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিতে গিয়েছিল তাঁরা সশস্ত্র ছিলেন। তাহলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদেরই বা হঠাৎ করে ট্রিগার হ্যাপি করে ১৫-১৬ রাউন্ড গুলি চালানোর প্রয়োজন হল কেন। আরও বড় প্রশ্ন যারা হামলা করল তাঁরা কেউ হতাহত হলেন না, মারা গেলেন ও গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হলেন বুথের লাইনে দাঁড়ানো ভোটাররা! যার বড় অংশই তৃণমূলের কর্মী বা সমর্থক! কোন সত্য এখানে ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা চলছে সেটাই এখন অনেকেই বুঝতে পারছেন। দুর্ভাগ্য এটাই দেখার কেউ নেই, বলার কেউ নেই, বিচার করারও নেই। বাংলায় আজ তাই বাঙালিকে গুলি করে মারা খুব সোজা হয়ে গিয়েছে।