ads

‘ভবিষ্যতের ভূত’ নির্বিঘ্নে দেখানোর ব্যবস্থা করতে রাজ্যকে নির্দেশ সর্বোচ্চ আদালতের I UBG NEWS


ওয়েব ডেস্কঃ ‘ভবিষ্যতের ভূত’-এর ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারল না পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনের ‘উপরতলা’। রাজ্যে চলচ্চিত্রটির নির্বিঘ্নে প্রদর্শন সুনিশ্চিত করার জন্য শুক্রবার পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। সর্বোচ্চ আদালতের দুই বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড় এবং হেমন্ত গুপ্তাকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ এ দিন এই অন্তর্বর্তী নির্দেশ দিয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, সেন্সর বোর্ড একবার কোনও চলচ্চিত্রকে ছাড়পত্র দিয়ে দিলে কেউ তার প্রকাশ্য প্রদর্শনে বাধা দিতে পারে না। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কলকাতা সহ সারা রাজ্যে মুক্তি পেয়েছিল এই ছবিটি। পরের দিনই আচমকা রাজ্যের প্রায় সমস্ত হলে ছবিটির প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়া হয়। কারণ হিসাবে ছবিটির পরিচালক অনীক দত্তকে হল মালিকরা জানিয়েছিলেন, ‘উপরতলার নির্দেশ’। সেই ‘উপরতলা’কেই শুক্রবার সুপ্রিম কোর্ট সপাটে চপেটাঘাত করল বলা যায়।
রাজনৈতিক ব্যঙ্গকাহিনীর ভঙ্গিতে ছবিটি নির্মাণ করেছেন অনীক দত্ত। পশ্চিমবঙ্গের শাসক দলকে ‘ভবিষ্যতের ভূত’-এ তিনি কার্যত তুলোধোনা করেছেন বলেই অভিমত। সেই কারণেই যে রাজ্যের তৃণমূল সরকারের ‘উপরতলা’ থেকে ‘আনঅফিসিয়াল’ ফতোয়া জারি করে সমস্ত হলে ছবিটির প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করেছিল ছবিটির প্রযোজক সংস্থা ইন্ডিবিলি ক্রিয়েটিভ প্রা‍‌ইভেট লিমিটেড। মামলার আবেদনে বলা হয়েছিল, পশ্চিমবঙ্গ সরকার পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার করছে এবং ‘সুপার-সেন্সর’-এর ভূমিকা নিয়েছে। মুক্তি পাওয়ার দ্বিতীয় দিনেই কোনও কারণ না দেখিয়ে বেশির ভাগ হল থেকে ছবিটি সরিয়ে দেওয়া হয়। নাম না প্রকাশ করার শর্তে বেশ কিছু হলের মালিক তাদের জানিয়েছেন, স্থানীয় থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক তখনই এ‍‌ই ছবির প্রদর্শনী বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেন্সর বোর্ড এই ছবিটিকে ইউএ শংসাপত্র সহ প্রকাশ্যে প্রদর্শনের অনুমতি দিয়েছে। তারপরেও এটির প্রদর্শনীতে এভাবে বাধা দিয়ে সংস্থার অধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে। প্রযোজক সংস্থার তরফে আরও বলা হয়, ছবিটি মুক্তি পাওয়ার আগে কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের একটি চিঠি দিয়ে গোয়েন্দা আধিকারিকদের জন্য এটির প্রাক-প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছিল। সেই চিঠিতে বলা হয়েছিল, ‘‘চলচ্চিত্রটির বিষয়বস্তু জনগণের অনুভূতিকে আঘাত করতে পারে, যা রাজনৈতিক আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা তৈরি করতে পারে।’’ এর উত্তরে কলকাতা পুলিশকে সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, সেন্সর বোর্ড ছাড়পত্র দেওয়ার আগে এই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখেছে। তারপরেও মুক্তি পাওয়ার পরের দিনই একতরফাভাবে ছবিটির প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়া হয়। ছবিটির পরিচালক এবং কয়েক জন শিল্পী ও কলাকুশলী আইনক্স সাউথ সিটিতে খোঁজ নিতে গেলে তাঁদের বলা হয়, ‘উচ্চতর কর্তৃপক্ষের নির্দেশে’ ছবিটি দেখানো হচ্ছে না। কলকাতার পুলিশ কমিশনারের কাছে এর ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও কোনও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি। এই নীরবতাতেই স্পষ্ট, গোটা বিষয়টিতে রাজ্য সরকার যুক্ত। এই বিষয়ে আইনের শাসন এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার রক্ষা করার জন্য রাজ্য সরকারের কাছে আরজিও জানানো হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার একটি অনমনীয় অবস্থান নেয়। তাতে আপাত স্পষ্ট যে, রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপেই গোয়েন্দাদের ছবিটি আগে দেখানোর জন্য ওই চিঠি পাঠিয়েছিল কলকাতা পুলিশ। কলকাতার হলগুলিতে বেআ‍‌ইনিভাবেই বাধা দেওয়া হয়েছে ছবিটির প্রদর্শনীতে। যেভাবে কোনও লিখিত নির্দেশ ছাড়াই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পিছন থেকে হস্তক্ষেপ করে ছবিটি বন্ধ করা হয়েছে, তা সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায় এবং আইনের নানা ধারার ইচ্ছাকৃত ও পরিকল্পিত লঙ্ঘন। প্রযোজক সংস্থার পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে এই বক্তব্য তুলে ধরেন আইনজীবী রুক্সানা চৌধুরি।
প্রযোজক সংস্থার এই বক্তব্যের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট এ দিন যে নির্দেশ দিয়েছে, তা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে বড় ধাক্কা বলেই মনে করা হচ্ছে। শুক্রবার সর্বোচ্চ আদালত জানিয়ে দিল, হলে ছবিটির প্রদর্শন বন্ধ করা যাবে না। শুধু তা নয়, নির্বিঘ্নে ছবিটি যাতে দেখানো যায়, তার জন্য রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি’কে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির বেঞ্চ। এই নির্দেশ শুনে পরিচালক অনীক দত্ত বলেছেন, ‘‘এমনই আশা করেছিলাম। বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে হতাশ হয়ে পড়তাম, যদি আমাদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় সুপ্রিম কোর্ট ব্যর্থ হতো। আশা করব, ‘উচ্চতর কর্তৃপক্ষ’ নতুন কোন‍‌ও ফন্দি আঁটবে না।’’ বাংলা চলচ্চিত্রের খ্যাতনামা পরিচালক তরুণ মজুমদার বলেছেন, ‘‘আমি অত্যন্ত খুশি এই রায়ে। অন্যায়ভাবে ছবিটি দেখানো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। চূড়ান্ত অসভ্যতা করা হয়েছে। তার থেকে নিষ্কৃতি পেল। আমি এই ছবির প্রদর্শনী বন্ধ করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ছিলাম। পাশে ছিলাম পরিচালক ও ছবিটির কলাকুশলীদের। আগামী দিনেও যদি আর কোনও ছবিকে এমন অন্যায় বাধার মুখে পড়তে হয়, তখনও পাশে থাকব।’’ সুপ্রিম কোর্টের রায় শুনে যথেষ্টই খুশি ছবির অভিনেত্রী দেবলীনা দত্ত। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, চলচ্চিত্র জগতের যাঁরা এখনও পর্যন্ত বোবা-কালা সেজে রইলেন, তাঁদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছে এই নির্দেশ। যাঁরা ছবিটি চলতে দেননি এবং যাঁরা কোনও প্রতিবাদ করেননি, তাঁরা সবাই সমান। উল্লেখ্য, শুক্রবারও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে কলকাতা হাইকোর্টকে বলা হয়েছে, রাজ্য সরকার ‘ভবিষ্যতের ভূত’ ছবিটির প্রদর্শন বন্ধ করতে কোনও নির্দেশ দেয়নি। এ দিন হাইকোর্টে এ কথা বলেন রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল কিশোর দত্ত। তখনও সুপ্রিম কোর্ট ছবিটির নির্বিঘ্নে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেয়নি রাজ্য সরকারকে। ছবিটির প্রদর্শন বন্ধ করার বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করেছেন ইশান মাধব দাস নামে এক ব্যক্তি। বিচারপতি দেবাংশু বসাকের এজলাসে এ দিন এই মামলার শুনানির সময়ে রাজ্য সরকারের তরফে বলা হয়, এই ছবির প্রদর্শন বন্ধ করার কোনও নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তবে এই ছবির প্রযোজককে পুলিশ একটি চিঠি দিয়ে বলেছিল, ছবিতে এমন কিছু বিষয়বস্তু আছে, যাতে আইন-শৃঙ্খলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। হয় তো এই আশঙ্কা থেকেই হল মালিকরা ছবিটি দেখানো বন্ধ করেছেন। রাজ্য সরকারের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে মামলাকারীর আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, হল মালিকরা পরিচালক অনীক দত্তকে জানিয়েছেন, ছবিটি দেখানো যাবে না। কারণ, ‘উপরতলা’র নির্দেশ রয়েছে। ভট্টাচার্য বলেন, একটি ছবি প্রদর্শনের জন্য সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পাওয়ার পর সেই ছবিটি কীভাবে চাপ সৃষ্টি করে বন্ধ করা যায়, তা এ ক্ষেত্রে বোঝা গিয়েছে। দর্শকদের অধিকার আছে হলে মুক্তি পাওয়া ছবি দেখার। তাতে কেউ বাধা দিলে তা সংবিধানের বিরোধিতা হয়ে দাঁড়ায়। সুপ্রিম কোর্টের এ দিনের নির্দেশে বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের এই বক্তব্যের যুক্তিগ্রাহ্যতাই মান্যতা পেয়েছে। এই মামলায় হাইকোর্টে আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যকে সহায়তা করছেন আইনজীবী সব্যসাচী চ্যাটার্জি।

Post a Comment